রোহিঙ্গা সংকট দ্রুত সমাধান হবে না: মালোক ব্রাউন

13

রোহিঙ্গা সংকটের কোনো দ্রুত সমাধান নেই বলে মনে করেন জাতিসংঘের সাবেক উপ-মহাসচিব লর্ড জর্জ মার্ক মালোক ব্রাউন। এ সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

শনিবার (৭ আগস্ট) রাজধানীর এক হোটেলে কসমস ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জন্য জাতিসংঘের প্রাসঙ্গিকতা: অংশীদারিত্বের ভবিষ্যত সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে এ আহ্বান জানান তিনি। খবর ইউএনবি’র।

তিনি বলেন, ‘এটি উদ্বাস্তুদের এক ধ্রুপদী দ্বিধা…বাস্তবতা হলো, এ (উদ্বাস্তু) সমস্যা নিজেদের দ্রুত সমাধান হতে দেয় না। এটি এক অবিচল সমস্যা।’

ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের প্রিন্সিপাল রিসার্চ ফেলো ড. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন কসমস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এনায়েতুল্লাহ খান।

মালোক ব্রাউন বলেন, এ বিষয়টি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ অংশের ‘অত্যন্ত গভীর ধৈর্য ও মানবিকতা’ দরকার। কারণ দেশের এক অংশে এমন আকারের উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠী এক বিশাল বোঝা।

‘একটি সমাধানে পৌঁছাতে মিয়ানমারকে রাজনৈতিক চাপ দিতে শুধু জাতিসংঘ নয়, সেই সাথে রাষ্ট্রগুলোও এগিয়ে আসেনি বলে যে কথা রয়েছে তার সাথে আমি ভিন্নমত পোষণ করি না,’ বলেন তিনি।

জাতিসংঘের সাবেক উপ-মহাসচিব বলেন, মিয়ানমারে অনেক রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটা দরকার এবং এ পরিবর্তনের জন্য দেশটির প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই চাপ প্রয়োগ করতে হবে।

‘আমি বাংলাদেশকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানাই,’ বলে তিনি উল্লেখ করেন যে উদ্বাস্তুরা থাকার জন্য আসেনি কিন্তু তারা যাতে থাকতে পারে সে জন্য পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

তিনি বলেন, এখানকার হতাশা ও সমাধান খুঁজে পাওয়ার প্রয়োজনীয়তা জাতিসংঘ উপলব্ধি করে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। ‘আমি মনে করি এ বিষয়টি যাতে রাজনৈতিক গুরুত্ব পায় সে জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আসন্ন অধিবেশনে বাংলাদেশের সাথে (জাতিসংঘ) কাজ করতে চায় এবং তাদের সমাধানের দিকে যাওয়া দরকার।’

মালোক ব্রাউন বলেন, অর্থনীতিতে এ অপ্রত্যাশিত বোঝার জন্য বাংলাদেশিদের মাঝে যে হতাশা রয়েছে তা বোধগম্য।

অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর কঠিন দিনগুলোতে জাতিসংঘের সংস্থাগুলো এ দেশকে ভীষণভাবে সাহায্য করেছিল। ‘তাই, বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য জাতিসংঘ খুবই প্রাসঙ্গিক, যে দেশ ভূরাজনৈতিক কারণে মাঝে মধ্যে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ে।’

তবে তার মতে, এফএও, ডব্লিউএইচও ও আইএলও’র মতো জাতিসংঘের কিছু মূল্যবান সংস্থাকে এখন পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।

মন্ত্রী বলেন, আইএলও বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতার শিকারে পরিণত হয়েছে এবং যে উদ্দেশে এটি গঠিত হয়েছিল এখন তা পূরণ করতে পারছে না।

ইউএনএইচসিআর ও ডব্লিউএফও’র মতো কিছু সংস্থা বাংলাদেশে ভালো কাজ করছে বলে জানান তিনি।

আসামের জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) নিয়ে উদ্বেগ সম্পর্কে মান্নান বলেন, ‘এটি এখনো উঠতি পর্যায়ে আছে। আমরা জানি সমস্যা হতে পারে যা আমাদের হয়তো যথা সময়ে আক্রান্ত করবে। কিন্তু আমাদের জল্পনা করা উচিত হবে না। আমি বলি যে এ ছোট ধরনের উপদ্রবের তুলনায় বন্ধুত্ব অনেক বেশি মূল্যবান। আমরা পরে এটা সমাধান করতে পারব বলে আমি মনে করি।’

এ সময় পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক বলেন, বাংলাদেশ তার জন্মের পর থেকেই সর্বদা জোটবদ্ধতার প্রতি বিশাল গুরুত্ব দিয়েছে এবং তা এখনো বিদ্যমান রয়েছে। ‘জাতিসংঘ ও এর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সাথে আমাদের শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে এবং তাদের জন্য বিশাল সমর্থন আছে।’

বাংলাদেশ শুধু আর্থিক নয়, সেই সাথে রাজনৈতিক অবদানের নিরিখে জাতিসংঘকে অনেক কিছু দিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার চর্চার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সবসময় সহায়ক।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, এক সময় জাতিসংঘ ছিল একমাত্র আন্তর্জাতিক জায়গা যেখানে রাষ্ট্রগুলো গিয়ে তাদের সমস্যা, বিভিন্ন বিষয় ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করত। ‘কিন্তু এখন আন্তর্জাতিক বিচারের জন্য আমাদের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) মতো সংস্থা আছে যা স্বাধীনভাবে গড়ে উঠেছে। আমাদের ডব্লিউটিও আছে যেখানে আমরা বৃহত্তর অর্থনৈতিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারি। সেই সাথে আমাদের আইএনজিও রয়েছে এবং তাদের কতগুলো প্রায় জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মতো বড়।’

তিনি বলেন, আইএনজিওগুলো সামাজিক বিশেষ করে মানুষের ভোগান্তি সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার বিশাল জায়গা তৈরি করেছে। ‘তাই, জাতিসংঘ বিশাল প্রতিযোগিতার মাঝে রয়েছে। এবং বাংলাদেশ উভয় ক্ষেত্রে সক্রিয় থাকতে চায়।’

কসমস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এনায়েতুল্লাহ খান বলেন, বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যাচ্ছে এবং এ ব্যাপারটিতে সহায়তার জন্য কসমস ফাউন্ডেশনের ‘বুদ্ধিবৃত্তিক পরিকাঠামো’ সবরাহের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ জাতিসংঘের জন্য কী করেছে শুধু তার প্রতি গুরুত্বারোপ নয়, সেই সাথে বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার বিচারে জাতিসংঘ সনদের একটি প্রধান উপাদান কীভাবে যথাযথভাবে ফলপ্রসূ হতে পারে সে জন্য এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।

চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের পরবর্তী অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে নিউইয়র্কে এ অতি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে আজকের আলোচনাকে হয়তো ‘পর্দা উত্তোলক’ হিসেবে দেখা হবে।

বিশিষ্ট বৈদেশিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ, ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশি দূত, সাবেক রাষ্ট্রদূত, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী ও সুশীল সমাজের সদস্যরা অনুষ্ঠানের সাধারণ আলোচনা পর্বে অংশ নেন।