পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কারুকার্যের বাড়ি গুলো

0
76

আপনারা কী জানেন পৃথিবীতে সবচেয়ে নিরাপদ স্থান কোনটি? পৃথিবীর যে স্থানে আপনি সবচেয়ে নিরাপদে থাকতে পারবেন সে স্থানটির নাম হচ্ছে ঘর। মানুষ থেকে শুরু করে বাঘ সিংহ পাখি এমনকি ক্ষুদ্র পোকা মাকড়রাও ঘর বানায় নিজেদের নিরাপদ রাখার জন্যে।

আমরাতো চোখ খুললেই মানুষের থাকার জন্যে দৃষ্টি নন্দন বড় বড় সব দালানকোটা দেখতে পাই। কোনোটি দেখে মুগ্ধ হই। কিন্তু আপনারা কী জানেন, পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর কারুকার্যের বাড়ি গুলো বানায় পাখিরা। তাদের সৃজনশীলতা দেখে আপনি চমকে যেতে বাধ্য হবেন। এই বাড়ি গুলো বানাতে তাদের হাজারবার উরাল দিতে হয়। কখনও গাছের ডালে, কখনও ঝোপঝাড়ে, কখনও আবার টই টই করা নদীর স্রোতের উপরে বাড়ি বানায় পাখিরা। দেখতে সহজ মনে হলেও এই বাড়ি গুলো বানাতে তাদের করতে হয় হাড়ভাঙ্গা খাটুনি।


(১) বাল্ড ঈগল
পৃথিবীতে শিকারী পাখি গুলোর ভেতর অন্যতম শক্তিশালী এবং চতুর পাখিটি হচ্ছে ঈগল। ঈগল প্রজাতির ভেতর দানবীয় আকৃতির ঈগল গুলোকে বলা হয় বাল্ড ঈগল। এই বাল্ড ঈগল গুলোর বাসাও হয় দানবীয় সাইজের। বাল্ড ইগলের বাসার প্রস্থ কখনও কখনও ৯ ফুটের বেশি হয়ে থাকে। গভীরতা হয় ২০ ফুটের কাছাকাছি। শুরুতে গাছের ডালে ঈগল ছোট ছোট ডাল আর লতাপাতা দিয়ে তাদের বাসা বানায়। ডিম ফুটে যখন বাচ্চা বের হয় তখন মা ঈগল তার বাচ্চাদের খেলেধুলে বেড়ানোর জন্য বাসার পরিধি বড় করতে থাকে।

আপনারা জানলে চমকে যাবেন ফ্লোরিডার সেন্ট পিটারস বারগে এমনি একটি বাল্ড ঈগল তার বাসার পরিধি বাড়াতে বাড়াতে ২ টন অর্থাৎ ২০০ কেজি ওজনের বানিয়ে ফেলেছিলো।   

 

(২) কমন টেইলর বার্ড
যাকে প্রথম দেখায় আপনি চড়ুই পাখি ভেবে বসতে বাধ্য। কিন্তু না এরা একদমই ভিন্ন প্রজাতির। দেখতে খানিকটা চড়ুই পাখিদের মত হলেও এরা চড়ুই পাখিদের মত লোকালোয়ে আসে না। এরা তাদের বাসা বানায় গভীর জঙ্গলে। এরা নিজেদের লম্বা সরু ঠোটের সাহায্যে গাছের পাতার সাথে মাকড়সার জাল বুনে বাসা বানিয়ে থাকে। অনেকটা টেইলর যেমন সুই দিয়ে জামা সেলাই করে ঠিক তেমন করে। আর এর জন্যই এই পাখি গুলোকে দরজি পাখি বা টেইলর বার্ড বলা হয়ে থাকে।   


(৩) এলফ আউল
বলা হয়ে থাকে সবচেয়ে ভয়ংকর পাখি এলফ আউল। মুখের অবয়বটা খানিকটা মানুষের মত হলেও এরা অতটা বিপদজনক নয়। এরা অন্য পাখি গুলোর তুলনায় একটু ভিন্ন। এরা নিশাচড় প্রাণী। রাতে শিকার করে দিনে ঘুমোয়। অনান্য পেঁচারা যেখানে উঁচু উঁচু গাছের ডালে বাসা বানায় সেখানে এলফ আউল বাসা বানায় বড় বড় ক্যাক্টাস গাছ গুলোর ভিতরে। তারা অত্যন্ত শৈল্পিক ভাবে ক্যাক্টাসের ভেতরে গর্ত করে বাসা বানায়। তাদের বাসা এতটা নিখুত করে বানানো হয় যে এলফ আউলরা বাসায় ঢুকে গেলে অন্য কোনো শিকারী পাখি এসে সেই বাসায় ঢুকে আক্রমণ করতে পারে না।

 

(৪) পেন্টাগনিয়ান সি বার্ড
দূর থেকে দেখলে মনে হবে পেঙ্গুইন। কিন্তু কাছে গেলে ভুল ভাঙবে আপনার। পেন্টাগনিয়ান সি বার্ড একতার প্রতীক। এই পেন্টাগনিয়ান সি বার্ড কেবল ক্যালিফোর্নিয়ার কিছু দ্বীপেই দেখতে পাওয়া যায়। যখন এদের প্রজননের সময় হয় তখন সমুদ্র তীরবর্তী শীতল স্থানে কয়েক লাখ  পেন্টাগনিয়ান সি বার্ড একত্রিত হয়ে কলোনী গঠন করে, যেন সেখানে তাদের অন্য কোনো শিকারী পাখি এসে আক্রমণ না করতে পারে। এ কলোনী গুলোর স্থায়িত্ব্য হয় ৩ মাস। প্রজনন শেষে তারা আবার যে যার মত উড়ে দূরে চলে যায়। 

 

৫) সোশিয়েবল উইফার বার্ড
এরা একমাত্র পাখি যাদের বাসাটা মৌমাছির চাকের মত হয়ে থাকে। বড় বড় গাছ গুলোর মগডালে কখনও আবার ইলেকট্রিক খাম্বার মাথায় শুকনো খড় কুটো দিয়ে এরা বাসা বানায়। একেকটি চাকে অনেক গুলো গর্ত থাকে যাতে অনেক গুলো উইফার বার্ড একসাথে থাকতে পারে। এর জন্যেই এদের নামের শুরুতে সোশিয়েবল বা সামাজিক শব্দটি লাগানো হয়। এরা এতটাই সামজিক যে তাদের বাসায় মাঝে মাঝে অন্য প্রজাতির পাখিরা এসেও আশ্রয় নিতে পারে।

 

৬) হর্নড কুট
হর্নড কুট যাদেরকে অনায়াসে পানির টাইটেনিক বলা যায়। এরা পানির উপরে বাসা বানায় আর সেই বাসা ঝড় বৃষ্টিতে সবসময় ভেঙে যায়। হাসের মত দেখতে এই পাখি গুলো জীবনের বেশির ভাগ সময় পানিতে ভাসে। আর তাই লোকালয় থেকে একটু দূরে এরা পানির উপরে তাদের ভাসমান বাসা বানায়। ডাঙা থেকে ৪০-৫০ ফিট দূরে গাছের ডালপালা আর শুকনো খড়কুটো দিয়ে এরা তাদের বাসা বানায়। যা দেখতে অনেকটা পানিতে ভাসমান দীপগুলোর মত মনে হয়। হর্নড কুট গুলো পানিতে বাস করে বিধায় এদের খাবারের জন্যে খুব একটা কষ্ট করতে হয় না। পানিতে বাস করা ছোট ছোট মাছ আর পোকামাকড় খেয়ে এরা বেঁচে থাকে।

৭) আফ্রিক্যান জ্যাকানা
এদেরকে পাখিদের ক্যাঙ্গারু বলা হয়। ক্যাঙ্গারুরা যেমন পেটের থলেতে বাচ্চা রাখতে পারে ঠিক তেমনি আফ্রিক্যান জ্যাকানা তাদের বাচ্চাগুলোকে নিজেদের পালকের ভেতরে তুলে রাখে। যাতে করে বাচ্চা জ্যাকানা গুলো পায় নিরাপদ আশ্রয় আর উষ্মতা। এই কাজটি করে থাকে পুরুষ জ্যাকানা গুলো। 
এই পাখি গুলোর জীবন কাটে পানির উপরেই। এদের নির্দিষ্ট কোনো বাসা থাকে না। পানির উপরে কখনও কোনো শক্ত মরা ডালে অথবা লতাপাতার উপরে এরা ক্ষণস্থায়ী বাসা বানায়। নদীতে যেখানটাকে নিরাপদ মনে হয় সেখানে স্ত্রী জ্যাকানা ডিম পাড়ে। এই পাখির ডিমগুলো দেখে আপনি চমকে যেতে বাধ্য। জ্যাকানার ডিম গুলোর রঙ হয় স্বর্ণালী। ডিমের উপরে ছোট ছোট সাপের মত কালো রঙের খাঁজ কাটা থাকে। যা আপনাকে শিহরিত করতে যথেষ্ঠ।

৮) গ্রেট হর্ন বিল
দেখতে সুন্দর এই পাখি গুলোকে ইন্ডিয়া নেপাল ভুটান তথা হিমালয়ের কাছাকাছি স্থানগুলোতে  দেখতে পাওয়া যায়। এদের গাঁয়ের কারুকার্য দেখে আপনার মনে হবে এ নিশ্চই কোনো শিল্পীর হাতের তুলির যাদু। এদের দেহের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটি হচ্ছে তাদের ঠোঁট। সরু ধারালো এই ঠোঁট দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি ধারালো। এই ঠোঁট দিয়ে তারা শক্ত গাছে গর্ত করে বাসা বানায়। স্ত্রী হর্ন বিল গুলো প্রজননের সময় সেই গর্তে ঢুকে পড়ে। ডিম পাড়া থেকে শুরু করে ডিম ফুটে বাচ্চা বের করে তাদের বড় করতে সময় লাগে ৩ মাস। এই ৩ মাস স্ত্রী হর্ন বিল গুলো বাড়ি থেকে বের হয় না। এ সময়টুকুতে বাহিরে থেকে নিরাপত্তা দেয় পুরুষ হর্ন বিল। সেই সাথে স্ত্রী ও সন্তানদের জন্যে সে খাবার যোগার করে আনে টানা ৩ মাস। 

 

৯) ইঞ্জিনিয়ার বার্ড
আসল নাম রুপোস হরনেরো। কিন্তু এদের শৈল্পিক কর্মকাণ্ড দেখে এদেরকে ইঞ্জিনিয়ার বার্ড বলেও ডাকা হয়। আর্জেন্টিনার জাতীয় পাখি রুপোস হরনেরোর বিচরণ পুরো সাউথ আমেরিকা জুড়ে। এরা মুলত তাদের সরু ঠোঁট দিয়ে কাদামাটি আর খড়কুটো তুলে এনে গাছের ডালে শৈল্পিকভাবে বাড়ি বানিয়ে থাকে। একটি বাড়ি বানাতে তাকে হাজারবারের উপরে ঠোকড় দিয়ে কাদামাটি নিয়ে আসতে হয়। বিধায় তাদের বাড়ি হয়ে তাকে শক্ত পোক্ত মজবুত। বাড়িগুলোর সামনে ছোট একটি গর্ত থাকে। যাতে করে সে ব্যতীত অন্য কোনো শিকারী পাখি যেন বাড়িতে ঢুকে আক্রমণ না করতে পারে।  এই বাড়ি গুলোতে তারা এক বছরের বেশি থাকে না। বছর শেষে অন্য কোথাও যেয়ে নতুন করে ঘর বানায়। আর তখন এই বাসা গুলোতে আশ্রয় নেয় অন্য কোনো পাখি। 

 

১০) উইভার বার্ড
যাকে আমরা বাবুই পাখি নামে চিনি। বলা হয়ে থাকে পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর পাখির বাসাটি হচ্ছে উইভার বার্ড কিংবা বাবুই পাখির বাসা। শক্ত সরু লম্বা ঘাস গুলো এনে পুরুষ বাবুই পাখি গাছের উঁচু ডালে বাড়ি বানায়। অর্ধেকের বেশি কাজ শেষ হলে তারা স্ত্রী বাবুই পাখিকে আমন্ত্রণ জানায়। স্ত্রী বাবুই পাখি এসে পরীক্ষা করে। তার কাছে যদি বাসাটা পছন্দ হয় তাহলে সে তার জীবন সাথীর সাথে মিলে বাসার বাকি কাজটুকু শেষ করে ফেলে। এই বাসা বানাতে আগস্ট থেকে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত সময় লাগে। বাবুই পাখির বাসা এতটাই নিখুত হয় যে পরবর্তী কয়েক বছর সেগুলো টিকে থাকে। এই বাসায় না ধোকে পানি। না ঝড় বাদলে এই বাড়ি গুলো ভেঙে পড়ে।   

Leave a Reply