prothombarta24

তরিক শিবলী: রাজধানী ঢাকার জলজট, যানজট ও হকারজট নিরসনে কার্যকর সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিলেন ঢাকার দুই মেয়র ও নগর পরিকল্পনাবিদেরা। একই সঙ্গে তাঁরা সরকারের কাছে ঢাকাকে রক্ষার জন্য গৃহীত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রত্যাশাও করেছেন।কিন্তু যানজট, জলজট, হকারজট- এই তিন জটে জটিল হয়ে উঠেছে নগরবাসীর জীবন। বিশেষত তিন জটের কারণে দূর্বিসহ হয়ে পড়েছে নগরজীবন।সড়কজুড়ে তীব্র যানজট আর ফুটপাতজুড়ে হকার জট নগরীর এটি প্রতিদিনকারই চিত্র। তবে গত কয়েকদিন ধরে এই তিন জট একেবারে অসহনীয় ওঠেছে। তার উপর কয়েকদিনের বৃষ্টিতে নগরজুড়ে দেখা দিয়েছে জলজট। বিভিন্ন রাস্তায় জমেছে পানি। ভাঙ্গাচোরা রাস্তায় পানি জমায় পথচারিদের পড়তে হচ্ছে সবচেয়ে বিপাকে।বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা শিহাব আহমদ। দুপুরে বেড়িয়েছিলেন অফিসের কাজে। তীব্র যানজটের কারণে হেঁটেই পেরোচ্ছিলেন। আবার সকল ফুটপাত হকারদের দখলে থাকায় রাস্তার পাশ দিয়েই কষ্ট করে হাঁটতে হচ্ছিল তকে। আচমকা পিছন দিক থেকে আসা একটি মোটরসাইকেল শিহাবের সামনে এসে রাস্তার গর্তে পড়ে। ওমনি গর্তে জমা পানি ছলকে পড়ে শিহাবের উপর। ময়লা পানিতে ভিজে যায় শিহাবের পোষাক। অগত্যা জরুরী কাজ ফেলে বাড়ি ফিরতে হয় তাকে। নগরীতে এমন দূর্ভোগের শিকার হতে হয়েছে অনেককেই। দুপুেির নগরীর গুরুত্বপুর্ণ কয়েকটি মোড় ঘুরে সব কটিতেই তীব্র যানজট দেখা গেছে। বৃষ্টিতেও কমছে না যানজট।

এদিকে ফুটপাতজুড়ে পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছন হকাররা। অনেকে সামিয়ানা টাঙ্গিয়ে অনেকটা স্থায়ী দোকান গড়ে তুলেছেন ফুটপাতে। ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা এসব দোকানে অবৈধভাবে লাগানো হয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগও।পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের দাবি, মহাসড়কে নিষিদ্ধ অটোরিকশাগুলো নগরে ঢুকে পড়েছে। এ কারণে যানজট আগের চেয়ে বেড়েছে। ফুটপাত দলমুক্ত করতে প্রচেষ্টা চলছে বলেও দাবি পুলিশের।একই দাবি নগর কর্তৃপক্ষেরও। পুলিশের মতে হকারদের উচ্ছেদ করে দিলে আবার বসে পড়ে। এদের পুণর্বাসন করা না গেলে ফুটপাত দখলমুক্ত করা কঠিন।রাজধানীতে গতকাল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিপাত । গুঁড়ি গুঁড়ি ও মুষলধারার বৃষ্টির পানিতে ভেসে যায় রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকা। রাজপথে থৈ থৈ পানি। অলিগলিসহ শাখা সড়কও পানিতে সয়লাব হয়ে যায়। এতে নগরজীবনে নেমে আসে সীমাহীন দুর্ভোগ। জলাবদ্ধতায় অনেকটা স্থবির হয়ে পড়ে নগরী। কোথাও কোথাও পাঁচ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে যানবাহনের লেগে যায় কয়েক ঘণ্টা। অফিসমুখী লোকজন ঘর থেকে বেরিয়েই পড়েন ভোগান্তিতে। বৃষ্টির কারণে রাজপথে রিকশা-সিএনজির সংখ্যা একেবারেই কমে যায়। যেগুলো ছিল সেগুলোতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়। অনেক সড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় যানবাহন চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। এতে আশপাশের সড়কগুলোতেও তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে অফিস শেষে ঘরমুখী মানুষকে ভয়াবহ বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। নগর পরিবহনের সংকট ও তীব্র যানজটের সঙ্গে নগরজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে নেমে আসে দুঃসহ যন্ত্রণা। মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার প্রকল্প এলাকায় পথচারী ও যানবাহনকে পড়তে হয় মহাবিড়ম্বনায়। কাদাপানিতে সয়লাব হয়ে যায় পুরো এলাকা। অনেক স্থানে রিকশা উল্টে কাদাপানিতে পড়েন যাত্রীরা।

রাজধানীর হাতিরপুল, মগবাজার, শান্তিনগর, মালিবাগ-মৌচাক, নয়াপল্টন, শেওড়াপাড়া, মিরপুর-১০ নম্বরসহ বিভিন্ন এলাকার সড়ক তলিয়ে যায়। রোকেয়া সরণির কাজীপাড়া থেকে মিরপুর-১০ নম্বর পর্যন্ত প্রধান সড়ক পানিতে সয়লাব হয়ে যায়। সচিবালয়ের সামনের রাস্তায়ও পানি জমে। এ ছাড়া নিচু এলাকায় তৈরি হয় জলাবদ্ধতা। অনেক এলাকার পানির সঙ্গে স্যুয়ারেজের লাইনের বর্জ্য যুক্ত হয়ে যাওয়ায় দুঃসহ অবস্থা সৃষ্টি হয়। ঝিগাতলা, ট্যানারি মোড়, শনিরআখড়া, রায়েরবাগ, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী, মানিক মিয়া এভিনিউ, কাকরাইল, বাড্ডা, কুড়িল, ভাটারা, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, কল্যাণপুর, বংশাল, আজিমপুর, লালবাগ, কমলাপুর, বাসাবো, মুগদাপাড়া, জুরাইনসহ বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এসব এলাকার প্রতিটি সড়কে লেগে যায় তীব্র যানজট। অনেক স্থানে ম্যানহোলে চাকা ঢুকে যাওয়ায় রিকশা উল্টে গিয়ে যাত্রী আহত হন। কাঁচাবাজারগুলোর দৃশ্য ছিল করুণ।তবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ জানায়, অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে সকাল থেকেই তাদের কর্মীরা বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নেন। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দিয়ে তারা খোলা ড্রেনগুলো পরিষ্কার রাখার চেষ্টা চালান।পদে পদে নানা যন্ত্রণা নাগরিক জীবনকে অসহনীয়ভাবে বিদ্ধ করে চলেছে। এবারও বর্ষায় সৃষ্টি হয়েছে বিপর্যয়কর অবস্থা। সামান্য বৃষ্টিতে বড় বড় রাস্তাগুলোও চলে যায় পানির নিচে, ভেতরের অলি-গলি, বাড়ি-ঘর হয়ে পড়ে জলাবদ্ধ। ঘন্টা-দিন ধরে মানুষকে হয়ে থাকতে হয় জলবন্দী। খাল, পুকুর সব ভরাট হয়ে গেছে, বৃষ্টির পানি বেরিয়ে যাওয়ার পথ নেই। বক্স-কালভার্ট-স্টর্ম স্যুয়ারেজ ইত্যাদি পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা পলিথিন ব্যাগসহ আবর্জনায় ভরাট হওয়াতে অচল। ওয়াসার পানির অবস্থাও কোনো বিষয়েই কোনো পরিকল্পনা নেই। সিটি কর্পোরেশন বেসামাল। রাস্তাঘাটে আবর্জনার স্তূপ, বর্জ্য কোথায় ফেলা হবে তার কোনো দিশা নেই। স্বাস্থ্যসম্মতভাবে এত বর্জ্য সরানো ও নিষ্কাশনের সামর্থ্যও তার নেই। নদী-নালা-লেক দখল হয়ে যাচ্ছে। দখল হয়ে যাচ্ছে খেলার মাঠ। ঢাকা আজ কেবল ‘ইটের পরে ইট, মাঝে মানুষ কীট।’ অসহনীয় হয়ে উঠেছে নাগরিক জীবন।

Leave a Reply