আ.লীগের সম্মেলন: বিতর্কিতরা আতঙ্কিত, আশাবাদী ‘ক্লিন ইমেজের’ নেতারা

0
854
Spread the love

এমরান হোসাইন শেখ: সরকারের চলমান শুদ্ধি অভিযানের ঢেউ লাগতে পারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর আসন্ন সম্মেলনগুলোতে। নেতৃত্ব থেকে ছিটতে পড়তে পারেন কেন্দ্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের অনেক বিতর্কিত নেতাই। ফলে তারা আতঙ্কে আছেন। অন্যদিকে দুর্নীতি ও অপকর্মের সঙ্গে জড়িতদের বাদ পড়ার সম্ভাবনায় আশাবাদী হয়ে উঠেছেন ত্যাগী ও ‘ক্লিন ইমেজের’ নেতারা। বিভিন্ন সময়ে ‘পদবঞ্চিত’ এই নেতারা মনে করছেন, শুদ্ধি অভিযানের ফলে তাদের জন্য দলীয় বিভিন্ন কমিটিতে স্থান পাওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।

আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে।

আগামী ২০ ও ২১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। এই সম্মেলনের আগে মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা ও উপজেলাগুলোর সম্মেলনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সহযোগী সংগঠন যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ ও ভ্রাতৃপ্রতিম শ্রমিক লীগের সম্মেলনের নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। এসব সংগঠন নভেম্বরে তাদের সম্মেলন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

চলমান শুদ্ধি অভিযানের প্রসঙ্গ টেনে দলটির নেতারা বলেছেন, দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা এবার বিতর্কিতদের বিষয়ে খুবই কঠোর। কোনোভাবেই তিনি অপকর্মের সঙ্গে জড়িতদের ছাড় দেবেন না। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেবেন। তাদের ডানা ছেঁটে দেবেন। এ কারণে তিনি কেন্দ্রীয় সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার পর ৩ সহযোগী ও ১টি ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সম্মেলন করার নির্দেশ দিয়েছেন। দলের ৭টি সহযোগী ও ৩টি ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের মধ্যে এই ৪টির নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এর বাইরে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অপর ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের নাম উঠে এলেও এটির কমিটির মেয়াদ পূর্ণ না হওয়ায় সম্মেলনের পরিবর্তে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে সম্প্রতি পরিবর্তন আনা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, দলের ইমেজ ফিরিয়ে আনতে চলমান শুদ্ধি অভিযান সব পর্যায়েই বিস্তৃত হবে। শুদ্ধি অভিযানের প্রভাব দেশবাসী নিশ্চয়ই তাদের সংগঠনেও দেখতে পাবে। যাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আছে তাদের বাদ দিয়ে তরুণ ও ক্লিন ইমেজের ব্যক্তিদের কমিটিতে স্থান দেওয়া হবে। যারা দলের আদর্শকে সমুন্নত রেখে রাজনীতি করেন, তারাই নেতৃত্বে আসবেন।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা বলেন, রাজনীতি যারা করতে চান, তাদের রাজনীতিই করতে হবে। রাজনীতির বাইরে কিছু করতে চাইলে তাদের অন্য পথ দেখতে হবে। রাজনীতিকে ব্যবহার করে কোনও টাকা-পয়সা কামানো যাবে না। অর্থ-বৈভবের মালিক হওয়া যাবে না। এটাই শেখ হাসিনার বার্তা। আর এটার প্রতিফলন কেবল আগামী সম্মেলন নয়, আগামীদিনের রাজনীতিতেও দেখা যাবে বলে দাবি করেন তিনি।

দলের বিতর্কিতদের বাদ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে গত বুধবার (২ অক্টোবর) গণভবনে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ডজনখানেক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে অনির্ধারিত এক বৈঠকে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, দলের ভেতরে পারমানেন্ট গভর্নমেন্ট পার্টি হিসেবে যারা জায়গা করে নিয়েছেন, তাদের চিহ্নিত করে দল থেকে বের করে দিতে হবে। দলটা তাদের নয়। আওয়ামী লীগ সবার দল। যারা ত্যাগী, বঞ্চিত, তাদের জায়গা করে দিতে হবে।

এই বৈঠকেই শেখ হাসিনা ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ৪ সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনের নির্দেশ দেন।

বৈঠক শেষে গণভবনের গেটে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতারা আওয়ামী লীগের আগামী কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা পাবেন। আওয়ামী লীগের সমচিন্তার নয়—এমন কেউ যাতে দলে অনুপ্রবেশ করতে না পারে, বিতর্কিত ব্যক্তিরা কমিটিতে স্থান না পায়, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে বলেছেন।’

সম্প্রতি দলীয় এক আলোচনা সভায় এই সাধারণ সম্পাদক বলেন, আওয়ামী লীগে লোকের অভাব নেই, তাই খারাপ লোকের দরকার নেই। ভালো লোকদের জন্য দরজা খুলে দিন। শেখ হাসিনা দরজা খুলে দিয়েছেন। ভালো লোকদের জন্য রাজনীতির দুয়ার খুলে দিতে হবে। আওয়ামী লীগের দরজা খুলে দিতে হবে।

ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ উপকমিটির সদস্য বাহাদুর বেপারী নিজেকে ক্লিন ইজেমের ব্যক্তিত্ব দাবি করে বলেন, মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তবে দলীয় নেতৃত্ব বিষয়ে তার নিজস্ব কোনও প্রত্যাশা নেই।

তিনি বলেন, দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার প্রত্যাশাই তার প্রত্যাশা। শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তই তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। শেখ হাসিনাই তাকে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি ভবিষ্যতে যখন প্রয়োজন হবে তাকে নেতৃত্বে নিয়ে আসবেন।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, শুদ্ধি অভিযানের আওতায় যারা আসবে দল তাদের কারো কোনও দায়িত্ব নেবে না। আর গঠনতন্ত্র পরিপন্থী কাজ করে কেউ দলে ঘাপটি মেরে থাকতে চাইলেও যখনই তার (শেখ হাসিনা) নজরে আসবে, সঙ্গে সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কোনও নেতার বিরুদ্ধে কোনও ধরনের অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগ নেই দাবি করে দলের এই সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, ‘আমাদের নেত্রী পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে তারা দলের কোনও জায়গায় থাকতে পারবে না। দল তাদের কোনও দায়িত্বও নেবে না।’ যেখানে থাকতেই পারবে না, সেখানে তাদের নেতৃত্বে আসার প্রশ্নই আসে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন পরিশুদ্ধ রাজনীতিবিদ। তার উন্নয়নের সঙ্গে অসঙ্গতি কিছু ধরা পড়লেই তিনি নির্ভেজাল করার জন্যই মানুষের কল্যাণে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এরই অংশ হিসেবে এই অ্যাকশন প্রোগ্রাম।’

চলমান শুদ্ধি অভিযানের প্রতিফলন আগামী সম্মেলনে দেখা যাবে মন্তব্য করে দলের এই যুগ্ম সম্পাদক বলেন, রাজনীতিকে তিনি পরিশুদ্ধ করতে চাচ্ছেন। গোটা দেশবাসীসহ আওয়ামী লীগের সব স্তরের নেতাকর্মীও এই প্রতিফলন সম্মেলনে দেখতে চান। তার প্রতিফলন তিনি নিশ্চয়ই ঘটাবেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চোরের মন সব সময় পুলিশ পুলিশ করে। যারা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড বা বিশৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িত তাদের মধ্যে আতঙ্ক তো থাকারই কথা। আর যাদের বিরুদ্ধে বিতর্ক নেই তারা আশাবাদী হবেন, এটাই স্বাভাবিক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here